বাংলা রচনা

স্বদেশপ্রেম প্রবন্ধ রচনা ।

ভূমিকাঃ যে দেশ আলো দিলে মুখে দিল অন্নজল । দিন দিন পরনে বস্ত্র তার প্রতি যদি সেই দেশের শ্যামল সিংহ প্রতিপালিত সন্তানদের ভালোবাসা না
থাকে তবে তারা কেবল অকৃতজ্ঞই নয় অধম । দেশের মানুষের রূপ প্রকৃতি তার পশুপাখি প্রতিটি ধূলিকণা তার সন্তানদের কাছে মমত্ববোধ, সে সন্তানের
অন্তরের অন্তঃস্থলে পরিগ্রহণ করেছিল আরদ্ধ শ্রীময়ী মূর্ত, সদস্যদের কাছে মানুষ সকল দিক দিয়েই ঋণী ।স্বদেশ প্রেম সেই ঋণ স্বীকার ও ঋণ শোধের উপায় মাত্র
তাইতো কবি বলেছেনঃ
সার্থক জনম আমার জন্মেছি,
এই দেশে সার্থক জনম,
মাগো তোমায় ভালোবেসে ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্বদেশপ্রেমঃ যে ভৌগলিক ও সামাজিক পরিবেশের মধ্যে মানুষ জন্মগ্রহণ করে, এবং বড় হয়ে ওঠে তার প্রতি সেখানকার মানুষের প্রতি,সেখানকার মানুষের প্রতি তার একটা স্বাভাবিক অন্তর আকর্ষণ
গড়ে ওঠে ।স্বদেশের পশুপাখি, তরুলতা থেকে শুরু করে তার প্রতিটি ধূলিকণা পর্যন্ত তার পরম কামনায় ধন । সে তখন আবেগ থেকে গেয়ে উঠে,
আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি
দেশের প্রতি আকর্ষণ থেকেই স্বদেশপ্রেমের উন্মেষ তখন মানুষ উপলব্ধি করে জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী ।
কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাস বলেছেনঃ
জননী জন্মভূমি তোমারি পরশে জীবন

দিতেছে জীবন মোরে নিশ্বাসে নিশ্বাসে ।
সুন্দর মুখ উজ্জ্বল তপন ।
হেরেছি প্রথমে আমি তোমারি আকাশে
তেজীয়ে মায়ের কোলেতে শিখিয়াছি
ঝুলি খেলা তোমারি ধূলিতে ।

স্বদেশপ্রেমের বহিরপ্রকাশঃ স্বদেশপ্রেম মানুষের অন্তরে কখনো থাকে সুপ্ত, কখনো জাগ্রত । কিন্তু স্বদেশ প্রেমের মূল গ্রহীত থাকে অন্তরের অন্তঃস্থলে, ঐক্যবদ্ধভাবে
যখন দেশের সকল মানুষকে জীবনধারায, একই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারা পৃষ্ট হয়ে একই আদর্শের অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে,তখন এই দেশ হয়ে উঠে শ্রীময়ী ।ফুলে ও
ফসলে । কাদা মাটি জলে তখন যথার্থ মাতৃভূমি হয়ে ওঠে । স্বর্গাদপি গরীয়সী জননী জন্মভূমি তখন সবাই সালাম দেয় ;সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা তখন অভিষেক হয় জননীরুপে ।
মহাকবি কায়কোবাদ তার বাংলা আমার কবিতায় লিখেছেন ঃ

বাংলা আমার
আমি বাংলার,
বাংলা আমার জন্মভূমি
গঙ্গা ও যমুনা,
পদ্মা ও মেঘনার
বহিয়াছে চরণ চুমি ।

স্বদেশপ্রেমের উন্মেষঃ সুখের দিনে দেশ প্রেম থাকে শক্তিময় । কিন্তু দুঃখের দিনে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে স্বদেশপ্রেমের হয় শুভ উদ্বোধন ।
পরাধীনতার দুঃখ বেদনা, পরদেশী ও অকথ্য নির্যাতনের স্বদেশপ্রেমের ঘুম ভাঙ্গে । কিংবা যখন বিদেশি শত্রুর আক্রমণের পর্যুদস্ত হয় ,তখন সমগ্র জাতি
ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বদেশের লাঞ্ছনা ও মর্যাদা রক্ষা করার জন্য দলে দলে ছুটে যায় তখন মনে হয় নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই
দেশ-দেশান্তরে ইতিহাস তার সাক্ষী প্রাণ বিসর্জন দিতে গিয়ে কোন কোন দেশ হয়েছে অভিরা এবং মহিলা
অনুষ্ঠান করে কিংবা জলন্ত অগ্নি তে প্রবেশ করে রেখেছে স্বদেশপ্রেমের উজ্জ্বল স্বাক্ষর ।

 

 

স্বদেশ প্রেমের স্বরূপঃ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ আত্মসম্মানবোধ থেকে ।যে জাতির আত্মসম্মানবোধ যত প্রখর,সেজাতি স্বদেশ প্রেম তত প্রবল । স্বদেশ প্রেম একপ্রকার
পরিশুদ্ধ ভাবাবেগ।নিঃস্বার্থ ,হিংসা বিহীন দেশপ্রেমী প্রকৃত স্বদেশপ্রেম । স্বার্থের গণ্ডির অতিক্রম করে বৃহত্তর স্বার্থের দিকে যখন মন পরিচালিত হয়, তখন আত্ম কল্যাণ
এর চেয়ে বৃহত্তর কল্যাণ প্রিয় হয়ে ওঠ, তখনই জলে উঠে স্বদেশপ্রেমের নিষ্কলুষ প্রদীপ শিখা ।স্বদেশের মান মর্যাদা এবং তার গৌরব রক্ষাকল্পে শহীদ হয়েছে কত অমর প্রান ।
দেশসেবার পথে বাধা বৃহত্তর । অত্যাচার সীমাহীন , কিন্তু পরদেশী শাসকের রক্তচক্ষ, উদ্ধত্য অস্ত্র কিংবা পথের কোন বাধা তাদের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে নিবৃত্ত করতে পারেনা ।তারা
মৃত্যুভয় কে তুচ্ছ করে এগিয়ে যায় দেশমাতৃকার ভালোবাসার টানে । তাই কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন ঃ
স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায় ?
দাসত্ব শৃঙ্খল কে পরিবে পায় হে
কে পরিবে পায় ?

স্বদেশপ্রেমের দৃষ্টান্তঃ স্বদেশ কে ভালোবাসতে গিয়ে যুগে যুগে বহু নেতা ও মনীষী নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন ।উপমহাদেশের তিতুমীর,
রানা প্রতা্‌ শিবাজী,ক্ষুদিরা, প্রফুল্, চাকী সূর্যসেন, প্রিতিলতা , নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী প্রমুখ নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে দৃষ্টান্ত
রেখে গেছেন । বাংলাদেশের.১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সালাম , বরকত , রফিক , জব্বার এবং১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন ,
মতিউর রহমান্‌মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ,মোস্তফা কামাল , মুন্সী আব্দুর রউফ , শেখ আব্দুর রহমান প্রমুখ ,অকাতরে জীবন দিয়ে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত হিসেবে অমর
হয়ে আছেন । এছাড়া শেরে বাংলা একে ফজলুল হক আব্দুল হামিদ খান ভাসানী , শেখ মুজিবুর রহমান , জিয়াউর রহমান কাদের আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নেহেরু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ।

অন্ধ স্বদেশপ্রেমঃ দেশ ও জাতির গৌরব বস্তু । কিন্তু অন্ধ স্বদেশপ্রেম ধারণ করে ভয়ঙ্কর রূপ, জাতিতে জাতিতে অনিবার্য করে তুলেছিল সংঘর্ষ ।
অন্ধপ্রদেশ এই কথা চিন্তা করে আবার স্বদেশের জায়গা যদি অপারেশন দেশপ্রেমকে আহত করে তবে সে
অন্ধ স্বদেশপ্রেম বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে ডেকে আনে ভয়াবহ রক্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত ।

স্বদেশপ্রেম বিশ্বপ্রেম ঃ স্বদেশপ্রেমের সঙ্গে বিশ্বপ্রেম কোন অমিল নেই ,কোনো সংঘাত নেই । স্বদেশপ্রেম বিশ্বপ্রেম এর সংক্ষিপ্ত সংস্করণ । বলা
বাহুল্য, স্বদেশ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ।স্বদেশের মধ্যস্থতায় বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে ।আমরা দেশকে ভালবেসে তার বদলে যে ভক্তি শ্রদ্ধা
নিবেদন করি , তা গিয়ে পৌঁছায় বিশ্বস্রষ্টার পদতলে ।কাজেই বলা যায়, স্বদেশপ্রেম বিশ্বপ্রেম এই প্রথম সোপান স্বদেশপ্রেমের অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে আমরা বিশ্ব
প্রেমের জগত উপনীত হতে পারে ।কাজেই স্বদেশপ্রেম বিশ্বপ্রেম এর উৎস এবং তাদের মধ্যে কোন সংজ্ঞা নেই ।

প্রসঙ্গ স্বদেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্যঃ স্বদেশপ্রেম মানবচরিত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য । স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ যেমন দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে ,
তেমনি সাহিত্য,শিল্প কলা বা অন্যান্য জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে কাজ করা ও দেশপ্রেমের লক্ষণ । তাই প্রত্যেকের কাজ হবে যার যার ক্ষেত্রে দেশের কল্যাণের কথা
চিন্তা করে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পাদন করা যাতে সদস্যের সব রকম উন্নতি সাধিত হয় ।দেশ প্রেম নিজের দেশকে জানতে শেখায় ভালবাসতে
শেখায় ।স্বদেশপ্রেমের মধ্যেই দেশ এগিয়ে যাওয়া যায় ফলে মানবতার মহান আদর্শ সম্প্রসারণ ঘটে ।

উপসংহারঃ স্বদেশ প্রেম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ।যথার্থ দেশপ্রেমিক’ দেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থাপন করেন না নিজের স্বার্থকে । দেশের স্বার্থে আত্ম বলিদান করতে
পারেন তিনি । সুভাষ বসু রানা, প্রতাপ সুলতান , ওয়াশিংটন হাজার .১৯৭১সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বাংলাদেশের বিশিষ্ট সেরকম দেশ প্রেমিক ।আমাদের সকলকে
স্বার্থহীন দেশ প্রেমিক হতে হবে । ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে দেশপ্রেমকে তবেই স্বাধীন জাতির মর্যাদা নিয়ে আনন্দের সাথে বেঁচে থাকা যাবে ।

Back to top button
Close